দোলপূর্ণিমা-শ্রীচৈতন্যের_আবির্ভাব_তিথি

46 Shares

1486 খৃঃ এর 18 ফেব্রুয়ারি (23 ফাল্গুন,1407 শকাব্দ)– 1533 খৃঃ এর আষাঢ় মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি।

চৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী। ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি ভক্তিবাদ আন্দোলনের পুরোধা।
অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নবদ্বীপে তিনি দোলপূর্ণিমা তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার মনে করেন। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ছিলেন ভাগবৎ পুরাণ ও ভগবদ্গীতায় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষ্ণব ভক্তিযোগ মতবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে পরম সত্ত্বার পূজা প্রচার করেন এবং জাতিবর্ণ নির্বিশেষে আচন্ডাল-ব্রাহ্মণের কাছে ‘হরে-কৃষ্ণ’ মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন।
এটি হল —
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম
রাম রাম হরে হরে।।

23 ফাল্গুন 1407 শকাব্দে দোলপূর্ণিমার রাতে চন্দ্রগ্রহণ চলাকালীন তাঁর জন্ম হয়। পিতার নাম জগন্নাথ মিশ্র এবং মাতায নাম শচী দেবী। চৈতন্যদেব এর পূর্বপুরুষরা ছিলেন শ্রীহট্টের(অধুনা সিলেট) বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা। অধ্যয়ন ও সংস্কৃতে সাহিত্য চর্চার জন্য জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করেন।

চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। শৈশবে তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পন্ডিত। তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। ব্যাকরণ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জনের পর মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি ছাত্রদের অধ্যয়নের জন্য একটি টোল স্থাপন করেন। তর্কশাস্ত্রে নিমাই পন্ডিতের খ্যাতি ছিল সর্বজনবিদিত। কেশব কাশ্মীর নামে এক দিগ্বিজয়ী পন্ডিতকে তরুণ নিমাই তর্ক-যুদ্ধে পরাস্ত করেন। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তাঁর ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল। প্রথমা পত্নী লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর সর্পদংশনে মৃত্যু ঘটলে মায়ের সবিশেষ অনুরোধে একপ্রকার অনিচ্ছ্বাসত্ত্বেও বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর পাণিগ্রহণ করেন।

গয়ায় পিতার পিন্ডদান করতে গিয়ে নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপালমন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তনের পর শিক্ষাভিমানী পন্ডিত থেকে কৃষ্ণভাবময় ভক্তরূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্য্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন। হিন্দু ধর্মের প্রবল জাতিভেদ উপেক্ষা করে তিনি সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরে ‘হরিবোল’ ধ্বনি বিতরণ করতেন। হরিনাম প্রচারে খোল করতাল সহযোগে অনুগামীসহ নবদ্বীপের রাজপথে ‘নগর সংকীর্তনে’বের হতেন। অত্যাচারী জগাই মাধাইকে তিনি ভক্তে পরিনত করেন। তাঁর প্রভাবে যবন হরিদাস বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। নবদ্বীপের শাসক চাঁদকাজী তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেন। চৈতন্য ভাগবতে আছে, জাতিভেদের অসারতা দেখানোর জন্য তিনি শূদ্র রামরায় কে দিয়ে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করিয়েছিলেন।

মাত্র 24 বছর বয়সে কাটোয়ায় কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষিত হওয়ার পর নিমাই ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ নাম গ্রহণ করেন। এরপর বাংলা ত্যাগ করে তিনি কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান পর্যটন করেন। যেমন — গৌড়, নীলাচল, বৃন্দাবন, দাক্ষিণাত্য ইত্যাদি। পথে সত্যবাঈ ও লক্ষীবাই নামে বারাঙ্গনাদ্বয় এবং ভীলপন্থ, নারেজী প্রভৃতি দস্যুগণ তাঁর শরণ গ্রহণ করেন। ভ্রমণকালে তিনি এসব অঞ্চলের ভাষা বিশেষভাবে শেখেন। যেমন — ওড়িয়া, তেলুগু, মালয়ালম প্রভৃতি। এইসময় তিনি অশ্রুসজল নয়নে অবিরত কৃষ্ণনাম জপ ও কঠোর বৈরাগ্য সাধন করতেন(আহার-নিদ্রা-ত্যাগ করে কৌপীনসার হওয়া)।
জীবনের শেষ 24 বছরের অধিকাংশ সময় তিনি জগন্নাথধাম পুরীতে অতিবাহিত করেন। ওড়িশার সূর্যবংশীয় হিন্দুসম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপ রুদ্র দেব চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। তিনি মহাপ্রভু ও তাঁর সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন।
বাংলার সুলতান তখন আলাউদ্দীন হোসেন শাহ। তাঁর কানেও শ্রীচৈতন্যের নাম পৌঁছেছিল। তিনি খোঁজখবর নিয়ে সব শুনে সন্তুষ্ট হলেন। তিনি উদার মনের মানুষ। বাংলায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারে তাঁর আপত্তি ছিলনা বিশেষ।
ভক্তদের মতে জীবনের শেষপর্বে চৈতন্যদেব ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতেন এবং অধিকাংশ সময়ে ভাবসমাধিস্থ হয়েই থাকতেন। বর্ণবাদকে আমল না দিয়ে সব বর্ণ ও জ্রতির মানুষকে কীর্তনে আহ্বান জানান। স্বাভাবিক কারণেই তিনি ব্রাহ্মণদের বিরাগভাজন হন। ব্রাহ্মণদের সামাজিক বিধিনিষেধ শ্রীচৈতন্যের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল।
1533 খৃঃ জুন/জুলাই মাস।
রথযাত্রার সময় রথের সামনে সংকীর্তন ও নৃত্য করার সময় মহাপ্রভুর পায়ে কাঁকর ফুটে যায়। সেই সংক্রমণের কারণেই আষাঢ় মাসের শুক্লা পঞ্চমী/সপ্তমী তিথিতে তিনি দেহত্যাগ করেন। কেউ বলেন ভাবাবেগে তিনি পুরীর সমুদ্রে নেমে গিয়েছিলেন। স্রোতের টানে দেহ ভেসে যায়। জগন্নাথের মূর্তিতে বিলীন হয়ে যাওয়ার গল্প বা রটনাও শোনা যায়।
তবে আসল কাহিনী হল পুরীর ব্রাহ্মণ পান্ডাদের হাতে খুন হন শ্রীচৈতন্য। তাঁর দেহও গুম/লোপাট করে দেওয়া হয়।

#অবতারত্ব
গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মতে, চৈতন্য মহাপ্রভু ঈশ্বরের তিনটি পৃথক রূপের আধার।
প্রথমত তিনি কৃষ্ণের ভক্ত।
দ্বিতীয়ত তিনি কৃষ্ণভক্তির প্রবক্তা।
তৃতীয়ত তিনি রাধিকার সাথে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ কৃষ্ণের স্বরূপ।
ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত চৈতন্য জীবনীগ্রন্থগুলির বর্ণনানুসারে, একাধিকবার তিনি অদ্বৈত আচার্য্য ও নিত্যানন্দ প্রভুকে বিশ্বরূপ দেখিয়েখিলেন।
চৈতন্যদেবের দেহকান্তি ও স্বভাব সম্পর্কিত একটি পদ :
“প্রকান্ড শরীর শুদ্ধ কাঞ্চন বরণ
আজানুলম্বিত ভুজ কমল লোচন।
বাহু তুলি হরি বলি প্রেমদৃষ্টে চায়
করিয়া কল্মষ নাশ প্রেমেতে ভাসায়।”

নূপুর সরকার দে রায়।
তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও স্থাপত্য (অরুণাভ সান্যাল) ।
ছবি : সংগৃহীত।

Facebook Comments
46 Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *