তারা দেবীর রূপের তাৎপর্য ও বৌদ্ধ তারার সুপরিচিত রূপসমূহ

11 Shares

তারা দেবী দ্বিতীয় মহাবিদ্যা। প্রত্যালীঢ়পদা অর্থাৎ শববক্ষে দক্ষিণপদ স্থাপিতা। ভয়ংকরী, মুণ্ডমালাভূষিতা, খর্বা, লম্বোদরী, ভীষণা, কটিতে ব্যাঘ্রচর্মাবৃতা, নবযৌবনা, পঞ্চমুদ্রা শোভিতা, চতুর্ভূজা, লোলজিহ্বা, মহাভীমা, বরদা, খড়্গ কাতরি দক্ষিণহস্তে ধৃতা, বামহস্তদ্বয়ে কপাল ও নীলপদ্ম, পিঙ্গলবর্ণ একজটাধারিণী, ললাটে অক্ষোভ্য প্রভাতসূর্যের মতো গোলাকার তিন নয়নশোভা, প্রজ্জ্বলিত চিতামধ্যে অবস্থিতা, ভীষণদন্তা, করালবদনা, নিজের আবেশে হাস্যমুখী, বিশ্বব্যাপ্ত জলের মধ্যে শ্বেতপদ্মের উপর অবস্থিতা।

তন্ত্রসারে তারার আরও একটি ধ্যানমন্ত্রে বর্ণিত হয়েছে: “শ্যামবর্ণা ত্রিনয়না দ্বিভূজা, বরমুদ্রা ও পদ্মধারিণী, চতুর্দিকে বহুবর্ণা ও বহুরূপা শক্তির দ্বারা বেষ্টিতা, হাস্যমুখী মুক্তাভূষিতা, রত্নপাদুকায় পাদদ্বয় স্থাপনকারিণী তারাকে ধ্যান করবে।” বৃহদ্ধর্ম পুরাণে তারাকে কেবল শ্যামবর্ণা ও কালরূপিণী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তন্ত্রসারে তারাকেই মহানীল সরস্বতী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারাপীঠের ব্রহ্মশিলায় খোদিত তারামূর্তিটি দ্বিভূজা, সর্পযজ্ঞোপবীতে ভূষিতা এবং তাঁর বাম কোলে পুত্ররূপী শিব শায়িত।
তারার মূর্তিকল্পনা কালী অপেক্ষাও প্রাচীনতর।মায়ের এই রূপটি নীলবর্ণা লোলজিহ্বা করালবদনা,একজটা-বিভূষণা। অর্ধচন্দ্র পাঁচখানি শোভিত কপাল। ত্রিনয়নী লম্বোদরী বাঘছাল পরিহিতা। মা উত্তরমুখী ও তাঁর বাম চরণ শিবের বুকে। নীলপদ্ম খড়্গ ছুরি ও সমুণ্ড খর্পর রয়েছে চারিহাতে – শিবের উপর দাঁড়িয়ে আছেন মা।মায়ের আট যোগিনী মাকে ঘিরে থাকেন – মহাকালী,রুদ্রানী ,উগ্রা ,ভীমা,ঘোরা ,ভ্রমরী,মহারাত্রি,ভৈরবী। চৈত্র মাসের শুক্লা নবমীতে কালরাত্রির দিনে মায়ের পূজা হয়। মেরুর পশ্চিমকূলে চোল বলে এক হ্রদে মায়ের আবির্ভাব। ত্রিযুগ ধরে ইনি সেখানে তপস্যা করেন, তারা সত্বগুণাত্মিকা তত্ত্ববিদ্যাদায়িনী। তারা ভক্তদের ভবসাগর পার করিয়ে দেন। তিনি তাঁর নাম তারা। তিনি ভক্তদের দৈহিক (দেহ সম্পর্কিত),দৈবিক (ভাগ্য সম্পর্কিত) এবং ভৌতিক (তথা পার্থিব সম্পর্কিত) সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেন।
এইসাথে তারা ভক্তদের ৫ রকম ক্লেশ থেকে মুক্তি প্রদান করেন –অবিদ্যা,অস্মিতা,রাগ,দ্বেষ,অভিনিবেশ।

তারামায়ের ভক্তরা অল্প প্রচেষ্টাতেই ধর্ম,অর্থ,কম,মোক্ষ লাভ করেন। তারা মা নির্গুণ,নিরাকারা ,জ্ঞানময়ী ,ব্রহ্মময়ী,পুর্নময়ী এবং শুন্যময়ী। মা শুচি অশুচির অতীত।

বামাচারে তাঁর সাধনা করতে হয়।তন্ত্রের শ্রেষ্ঠতম সাধনা এই তারা সাধনা। তারা মা মায়াপ্রপঞ্চর অতীত,আবার তা সত্বেও এর মধ্যেই বিরাজ করেন কারণ মায়া তাঁরই সৃষ্টি।

তিনি শ্মশানে বাস করেন বলে তিনি স্মশানবাসিনী আর এজন্যে অনেক ভক্ত তাঁর সম্পর্কে ভুল ধারণা করেন। এই শ্মশান কিন্তু আসলে রূপক। মা প্রতিটি ভক্তের হৃদস্মশানে অধিষ্ঠিত থাকেন। ভক্ত যখন তাঁর সাধনা করেন তখন জ্ঞানাগ্নি রূপে প্রকট হন মা এবং ভক্তকে হাত ধরে নিয়ে যান অমৃতের লোকে মোক্ষের ঠিকানায়। তারা সাধনায় মা প্রথমে দেন ভোগসুখ ও অবশেষে মোক্ষ।তারাসাধনার মাধ্যমে সাধকের অবিদ্যা নাশ হয়,মোহ থেকে লাভ হয় মুক্তি এবং সবশেষে মোক্ষ,অর্থাত সাধককে আর ফিরে আসতে হয়না এই দুঃখময় সংসারে।

তারা মা বাকশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলে তাঁকে নীল সরস্বতী বলা হয়। উগ্র বিপদ থেকে ভক্তদের রক্ষা করার জন্যে তিনি উগ্রতারা নামেও খ্যাত।তারার বিভিন্ন রূপান্তর – উগ্রতারা, নীল সরস্বতী, একজটা তারা,কুরুকুল্লা তারা, খদির বাহিনী তারা, মহাশ্রী তারা, বশ্যতারা, সিতাতারা,ষড়ভূজ সিতাতারা, মহামায়া বিজয়বাহিনী তারা ইত্যাদি। বৌদ্ধ ধর্মেও তারা দেবীর পূজা প্রচলিত। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের বলভদ্রদেবের বিগ্রহ কিন্তু এই তারা যন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত যেমন জগন্নাথ প্রতিষ্ঠিত দক্ষিনাকালির যন্ত্রের উপর এবং সুভদ্রা প্রতিষ্ঠিতা ভুবনেশ্বরী যন্ত্রের উপর।

আর্যতারা হলেন মহাযান বৌদ্ধধর্মের একজন নারী বোধিসত্ত্ব, যিনি বজ্রযান বৌদ্ধধর্মে একজন নারী বুদ্ধের মর্যাদা পান। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে তাঁকে জেতসুন দোলমা বলা হয়। তিনি “নির্বাণ-জননী” হিসেবে পরিচিত। তারা কাজ ও কীর্তির গুণাবলির সাফল্যের প্রতিনিধি। জাপানে তিনি “তারা বোসাতসু” নামে পরিচিত। চীনা বৌদ্ধধর্মে তিনি দৌলাও পূসা নামে স্বল্প-পরিচিত।

তারা একজন তান্ত্রিক ধ্যান দেবী। বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের তিব্বতি শাখাটি তাঁর ধ্যান অনুশীলন করে আন্তরিক গুণাবলির বিকাশ এবং দয়া ও শূন্যতার বাইরের, অন্তরের এবং গোপন শিক্ষা অনুধাবনের জন্য। একই শ্রেণীর বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বগণের গোষ্ঠীনাম হিসেবেও তারা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বোধিসত্ত্বেরা প্রায়শই বৌদ্ধ গুণাবলির উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হন। সেই দিক থেকে এই ধারণাটি আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

বৌদ্ধ তারার সুপরিচিত রূপগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

হরিত তারা(শ্যামাতারা) -বোধিপ্রাপ্ত ক্রিয়াকর্মের বুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।
শুক্লতারা(সীতাতারা)- দয়া, দীর্ঘজীবন, আরোগ্যদান ও শান্তি হিসেবে পরিচিত; এছাড়াও চিন্তাচক্র বা কল্পতরু চক্র হিসেবেও পরিচিত।

রক্ততারা(কুরুকুল্লা)- সকল ভাল জিনিস চুম্বকীকরণের সঙ্গে যুক্ত ভয়াবহ রূপ।

কৃষ্ণতারা-শক্তির সঙ্গে যুক্ত।

পীততারা(ভৃকুটি) – সম্পদ ও বিকাশের সঙ্গে যুক্ত।

নীলতারা-ক্রোধের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।

চিত্তমণি তারা-তারার একটি রূপ যা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের গেলাগ শাখায় সর্বোচ্চ যোগ তন্ত্রে বহুলভাবে প্রচলিত। এঁর গাত্রবর্ণ সবুজ দেখানো হয় এবং প্রায়শই হরিত তারার সঙ্গে এক হিসেবে দেখানো হয়।

খদিরবরনী তারা– ইনি দক্ষিণ ভারতে নাগার্জুনের সামনে আবির্ভূতা হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। এঁকে প্রায়শই “২২তম তারা” বলা হয়।
বৌদ্ধধর্মের কোনো কোনো সম্প্রদায়ে “একুশ তারা” স্বীকৃত। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের চারটি সম্প্রদায়ই সকালে একুশ তারা স্তোত্র আবৃত্তি করে।
তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে তারা হলেন দয়া ও কার্যের একজন বোধিসত্ত্ব। তিনি হলেন অবলোকিতেশ্বরের নারী মূর্তি। কোনো কোনো সৃষ্টি উপাখ্যান অনুসারে তিনি অবলোকিতেশ্বরের চোখের জল থেকে উৎপন্ন হয়েছেন ।

Source : Wikipedia , অনন্তের সন্ধানে ।

Facebook Comments
11 Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *